শনিবার, জুন ১৫, ২০২৪
Arabic AcademyArabic Academy
Arabic Academy

ইতিকাফ : আল্লাহর নৈকট্য লাভের মহিমান্বিত ইবাদত

এপ্রিল ০১, ২০২৪Uncategorized
ইতিকাফ : আল্লাহর নৈকট্য লাভের মহিমান্বিত ইবাদত

ইতিকাফ : আল্লাহর নৈকট্য লাভের মহিমান্বিত ইবাদত

আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নৈকট্য লাভ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল হল ইতিকাফ।

দুনিয়ার যাবতীয় ব্যস্ততাকে পাশে ঠেলে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে, আল্লাহর ঘর মসজিদে অবস্থানের এই যে বিধান- নিঃসন্দেহে তা বান্দার প্রতি রাব্বুল আলামীনের অনেক বড় ইহসান। বান্দার উচিত এই মহান বিধানের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া এবং আবেগ ও মহব্বতের সাথে এই আমলের প্রতি উৎসাহী হওয়া।

দুনিয়ার জীবন ব্যস্ততাবহুল। জীবনের সকল অনুষঙ্গই এমন, যা মানুষের ধ্যান ও চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, স্বপ্ন, কর্ম, লক্ষ্য ইত্যাদি বহু বিষয় মানুষকে শতধা-বিক্ষিপ্ত করে রাখে। তাই সহজেই সুযোগ হয় না পরকালীন জীবন নিয়ে ভাবার; কিংবা একান্ত মনোযোগের সাথে ইবাদতে মগ্ন হওয়ার। ইতিকাফ সেই সুযোগকেই অবারিত করে। বান্দাকে আল্লাহর জন্য নিবেদিত হতে সাহায্য করে।

ইসলামে ইতিকাফের বিধান অনেক প্রাচীন। কুরআন মাজীদে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَ عَهِدْنَاۤ اِلٰۤی اِبْرٰهٖمَ وَ اِسْمٰعِیْلَ اَنْ طَهِّرَا بَیْتِیَ لِلطَّآىِٕفِیْنَ وَ الْعٰكِفِیْنَ وَ الرُّكَّعِ السُّجُوْدِ.

আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার ঘরকে সেইসকল লোকের জন্য পবিত্র কর, যারা (এখানে) তাওয়াফ করবে, ইতিকাফ করবে এবং রুকু ও সিজদা করবে। -সূরা বাকারা (২) : ১২৫

এই আয়াত থেকে বুঝা যায়, ইতিকাফের বিধান হযরত ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ.-এর যামানাতেও ছিল।

তাছাড়া এক হাদীসে এসেছে, উমর ইবনুল খাত্তাব রা. জাহেলী যুগে মসজিদে হারামে এক রাত ইতিকাফের মান্নত করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর এ বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলে নবীজী তাকে সেই মান্নত পুরা করার নির্দেশ দেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ২০২৩

ইতিকাফের পরিচয় ও প্রকার

ইতিকাফ আরবী শব্দ। যার অর্থ হল, অবস্থান করা, অভিমুখী হওয়া, নিবেদিত হওয়া, নিরবচ্ছিন্ন হওয়া ইত্যাদি।

পরিভাষায় ইতিকাফ হল, আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে দুনিয়ার যাবতীয় ব্যস্ততাকে গুটিয়ে, এমন মসজিদে অবস্থান করা, যেখানে জামাতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করা হয়।

ইতিকাফ তিন প্রকার :

১. সুন্নত ইতিকাফ।

রমযানের শেষ দশকে একুশ তারিখের রাত [অর্থাৎ ২০ তারিখ সূর্যাস্তের আগ] থেকে ঈদের চাঁদ দেখা পর্যন্ত ইতিকাফ করা।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বছর এ দিনগুলোতে ইতিকাফ করতেন, তাই একে সুন্নত ইতিকাফ বলা হয়।

২. নফল ইতিকাফ।

রমযানের শেষ দশকে পূর্ণ দশ দিনের কম ইতিকাফ করা। অথবা বছরের অন্য যেকোনো সময় যতক্ষণ ইচ্ছা, ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা।

৩. ওয়াজিব ইতিকাফ।

মান্নতকৃত ইতিকাফ এবং সুন্নত ইতিকাফ ফাসেদ হয়ে গেলে তার কাযা আদায় করা।

ইতিকাফের স্থান

সওয়াবের দিক থেকে ইতিকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হল মসজিদে হারাম। এরপর মসজিদে নববী। তারপর মসজিদে আকসা। এরপর যেকোনো জামে মসজিদ। তারপর যেকোনো পাঞ্জেগানা মসজিদ।

তবে নারীদের জন্য ইতিকাফের স্থান হল ঘরের নির্দিষ্ট কোনো স্থান। (দ্র. শরহু মুখতাসারিত তহাবী ২/৪৭০; মাবসূত, সারাখসী ৩/১১৫; বাদায়েউস সানায়ে ২/২৮০-২৮১; রদ্দুল মুহতার ২/৪৬৯)

ইতিকাফের ফযীলত ও ফায়েদা

ইতিকাফ শিআরে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত একটি মাসনূন আমল। উপরন্তু রমযানের ফযীলত ও বরকত লাভ করার ক্ষেত্রে ইতিকাফের ভূমিকা অপরিসীম।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদানী জীবনে কেবল একটি রমযানে (জিহাদের সফরে থাকার কারণে ) ইতিকাফ করতে পারেননি। তাই পরবর্তী বছর ২০ দিন ইতিকাফ করে তা পূরণ করে নিয়েছেন। এছাড়া তিনি সব রমযানে ইতিকাফ করেছেন। সাহাবীগণও তাঁর সঙ্গে ইতিকাফে শরীক হয়েছেন। হাদীস শরীফে এসেছে-

أن النبيَّ صلى الله عليه وسلم كان يعتكِفُ العشرَ الأواخِرَ من رمضانَ، فلم يعتكِفْ عاماً، فلما كان العامُ المُقْبِلُ اعتكفَ عشرينَ ليلةً.

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানে শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু এক বছর ইতিকাফ করতে পারেননি। পরবর্তী বছর বিশ রাত (দিন) ইতিকাফ করেছেন। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৪৬৩

ইতিকাফের মাধ্যমে লাইলাতুল কদর লাভ করার সম্ভাবনাও অনেক বেশি থাকে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাইলাতুল কদর লাভের আশায় একবার রমযানের প্রথম দশ দিন ইতিকাফ করেন। এরপর কয়েকবার ইতিকাফ করেন মাঝের দশ দিন। এরপর একসময় শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতে শুরু করেন এবং ইরশাদ করেন-

تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ.

তোমরা রমযানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ কর। -সহীহ বুখারী, হাদীস ২০২০

আরো দ্রষ্টব্য : লাতাইফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা ৩৫৩

আরেক হাদীসে এসেছে-

كَانَ يَعْتَكِفُ فِي الْعَشْرِ الْأَوْسَطِ مِنْ رَمَضَانَ، فَاعْتَكَفَ عَامًا، حَتَّى إِذَا كَانَ لَيْلَةَ إِحْدَى وَعِشْرِينَ، وَهِيَ اللَّيْلَةُ الَّتِي يَخْرُجُ مِنْ صَبِيحَتِهَا مِنِ اعْتِكَافِهٖ، قَالَ: مَنْ كَانَ اعْتَكَفَ مَعِي فَلْيَعْتَكِفِ الْعَشْرَ الْأَوَاخِرَ، وَقَدْ أُرِيتُ هَذِهِ اللَّيْلَةَ ثُمَّ أُنْسِيتُهَا…

فَالْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ، وَالْتَمِسُوهَا فِي كُلِّ وِتْرٍ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের মাঝের দশ দিন ইতিকাফ করতেন। এক বছর এভাবে ইতিকাফ করার পর যখন রমযানের ২১তম রাত এল… তিনি ঘোষণা করলেন, যে ব্যক্তি আমার সঙ্গে ইতিকাফ করেছে সে যেন শেষ দশকে ইতিকাফ করে। কারণ আমাকে শবে কদর সম্পর্কে অবগত করা হয়েছিল (যে, তা শেষ দশকের অমুক রাত।) এরপর তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। … সুতরাং তোমরা শেষ দশকে শবে কদর অন্বেষণ কর এবং প্রতি বেজোড় রাতে অন্বেষণ কর। -সহীহ বুখারী, হাদীস ২০২৭

ইতিকাফের গুরুত্বপূর্ণ একটি ফায়দা হল- ইতিকাফকারী অত্যন্ত পবিত্র ও গোনাহমুক্ত পরিবেশে থাকে। শরীয়তের দৃষ্টিতে এখানে তার অবস্থানটিই এক ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। তাই সে অবসর সময়ে কোনো আমল না করলেও দিনরাত তার মসজিদে অবস্থান করাটাই ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়।

এমনিভাবে ইতিকাফকারী দুনিয়ার যাবতীয় ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে। আল্লাহর ইবাদতের জন্য নিজেকে পূর্ণ প্রস্তুত করে আল্লাহ-অভিমুখী হয়। অভিজ্ঞজনমাত্রই জানেন, এটা যে কারো জন্য, যে কোনো সময় সহজেই সম্ভব হয় না।

তাছাড়া ইতিকাফের মাধ্যমে রোযার যাবতীয় হক ও আদাব রক্ষা করার তাওফীক হয়।

সর্বোপরি ইতিকাফ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও মহিমান্বিত একটি ইবাদত। যার ফায়েদা ও প্রভাব মানুষের মন ও মননে এবং জীবন ও জগতে অনেক গভীর হয়ে থাকে।

ইতিকাফের প্রস্তুতি

ইতিকাফের উদ্দেশ্যে মানুষ যেহেতু আল্লাহর ঘর মসজিদে আসে, সেজন্য মানবীয় সাধ্যের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে আসা উচিত। মনে রাখা উচিত, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পূত-পবিত্র। আল্লাহর ঘর সর্বোচ্চ সম্মানিত ও পবিত্রতম স্থান। তাই প্রথমে নিজের বাহ্যিক পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা গ্রহণ করা উচিত। স্মরণ করা উচিত কুরআন মাজীদের নিম্নোক্ত আয়াত-

یٰبَنِیْۤ اٰدَمَ خُذُوْا زِیْنَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ.

হে আদম-সন্তানেরা! যখনই তোমরা কোনো মসজিদে আসবে, তখন নিজেদের শোভা অবলম্বন করবে (অর্থাৎ পোশাক পরে নেবে)। -সূরা আ‘রাফ (০৭) : ৩১

এই আয়াতে পোশাক পরে তাওয়াফ ও নামায আদায়ের নির্দেশ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে উত্তম পোশাক পরার কথাও। যে পোশাক পবিত্র ও সুন্দর এবং ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে শোভাবর্ধনকারী। [দ্র. তাফসীরে ইবনে কাসীর ৩/৪০৫; তাফসীরে ইবনে আতিয়্যাহ ২/৩৯২]

পাশাপাশি নিজের অভ্যন্তরীণ পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার প্রতিও দৃষ্টি দেওয়া কাম্য। কেননা অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা ছাড়া বাহ্যিক পবিত্রতা থেকে কাক্সিক্ষত ফায়েদা লাভ করা যায় না। সেদিকেও ইশারা করা হয়েছে একটি আয়াতে –

یٰبَنِیْۤ اٰدَمَ قَدْ اَنْزَلْنَا عَلَیْكُمْ لِبَاسًا یُّوَارِیْ سَوْاٰتِكُمْ وَ رِیْشًا  وَ لِبَاسُ التَّقْوٰی ذٰلِكَ خَیْرٌ .

হে আদম-সন্তানেরা! আমি তোমাদের জন্য পোশাকের ব্যবস্থা করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং (ব্যবস্থা করেছি) সাজ-সজ্জার বস্তু। তবে তাকওয়ার যে পোশাক, সেটাই সর্বোত্তম। -সূরা আরাফ (৭) : ২৬

অর্থাৎ বাহ্যিক পোশাক যেমন মানুষের দেহকে আবৃত করে রাখে, তেমনি তাকওয়ার পোশাক মানুষের গোনাহপ্রবণ স্বভাবকে আবৃত করে রাখে। আর দুনিয়ার জীবন ও আখেরাতের প্রতিফল- উভয়ক্ষেত্রেই তাকওয়ার পোশাক বেশি উপকারী। (দ্র. তাওযীহুল কুরআন, সংশ্লিষ্ট আয়াতের টীকা)

মোটকথা, আল্লাহর ঘরে হাজির হওয়ার আগে প্রথম কাজ হল, সার্বিক পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা অর্জন করা। তওবার মাধ্যমে নিজের অতীত গোনাহ ক্ষমা করিয়ে নেওয়া এবং আল্লাহর ঘরের আদব রক্ষা করে থাকার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা এবং কায়মনোবাক্যে দুআ করা।

এরপর নির্দিষ্ট সময় অবস্থানের জন্য যতটুকু সামানা না হলেই নয়, সেটুকু নিয়ে আসা। কোনো সামানাপত্রের বিষয়ে যেন অন্যের মুখাপেক্ষী হতে না হয়- সেই দিকটিও খেয়াল রাখা।

সেইসাথে ইবাদতের চিন্তা ও মানসিকতা ধারণ করা। ধ্যান ও মনকে আল্লাহ-অভিমুখী করা এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তকে জাগরূক করা।

মসজিদের থাকার কিছু আদব

মসজিদ আল্লাহর ঘর। এ ঘরের মর্যাদা দুনিয়ার সকল ঘর থেকে বেশি। এ জায়গার সম্মান অন্য সকল জায়গার চেয়ে অধিক। হাদীস শরীফে এসেছে-

أَحَبُّ البِلَادِ إِلَى اللهِ مَسَاجِدُهَا وَأَبْغَضُ البِلَادِ إِلَى اللهِ أَسْوَاقُهَا.

আল্লাহ তাআলার কাছে সবচাইতে প্রিয় জায়গা হল মসজিদ। সবচাইতে অপ্রিয় জায়গা বাজার। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৬৭১

ইতিকাফের সময় মানুষ যেহেতু এই পবিত্র মর্যাদাপূর্ণ স্থানেই অবস্থান করে, তাই এ ঘরের সম্মান ও মর্যাদার কথা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে স্মরণ রাখা উচিত।

 

হাদীস শরীফে মসজিদকে পবিত্র রাখার বিষয়েও জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। (দ্র. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৫৫)

তাই নিজের কারণে যেন মসজিদে কোনো অপবিত্রতা সৃষ্টি না হয় সেদিকে সযত্ন খেয়াল রাখা।

মসজিদে যতক্ষণ থাকা হয়, ওযু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করা। হাদীস শরীফে এ বিষয়েও খুব গুরুত্বের সাথে উৎসাহিত করা হয়েছে। (দ্র. সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৫৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৬৪৯)

এমনকি পেঁয়াজ, রসুন এবং এজাতীয় গন্ধযুক্ত কোনো খাবার খেয়ে মসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ এমন গন্ধযুক্ত কোনো খাবার খেলে ভালোভাবে মুখ পরিষ্কার করে নেওয়ার ব্যাপারে তাগিদ করা হয়েছে। (দ্র. সুহীহ বুখারী, হাদীস ৫৪৫২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৫৬৪)

অহেতুক কথাবার্তা ও উঁচু আওয়াজে কথা বলা থেকে বিরত থাকা। মসজিদে তা করতে নিষেধ করা হয়েছে। (দ্র. সহীহ মুসলিম, হাদীস ৫৬৮)

সেজন্য অতি প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া মসজিদে অন্য কোনো কথা বলা উচিত নয়।

মসজিদে অবস্থানকালে পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও অপেক্ষাকৃত সুন্দর পোশাক পরে থাকাই কাম্য। সেইসাথে নিজে পরিপাটি হয়ে থাকা এবং সামানাপত্র পরিপাটি করে রাখা। [দ্র. সূরা আ‘রাফ (৭) : ৩১]

সর্বোচ্চ আবেগ ও আগ্রহের সাথে মসজিদ পরিষ্কার রাখা উচিত। একটি হাদীসে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

আমার সামনে আমার উম্মতের ভালো ও মন্দ আমলসমূহ পেশ করা হয়েছে। তখন তাদের ভালো আমলগুলোর মধ্যে পেলাম- রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া। আর মন্দ আমলগুলোর মধ্যে পেলাম- মসজিদের কফ-থুথু (ময়লা-আবর্জনা) পরিষ্কার না করা। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৫৫৩

ইতিকাফে বিশেষ করণীয়

ইতিকাফের সময় বান্দা যেহেতু মসজিদে থাকে, তাই মসজিদের যাবতীয় আদব রক্ষা করে থাকা উচিত। পুরো সময় সতর্কতার সাথে থাকা উচিত, যেন কোনো ধরনের কোনো গোনাহ না হয়। এছাড়াও নিম্নোক্ত আমলগুলোর ব্যাপারে খেয়াল রাখা।

মসজিদের প্রধান আমল হল, জামাতের সাথে ফরয নামায আদায় করা। তাই সর্বোচ্চ গুরুতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামায তাকবীরে উলার সাথে আদায় করা।

ইতিকাফের সময় মানুষ যেহেতু দুনিয়াবি সকল কাজ কর্ম থেকে বিরত থাকে। তাই খুশু-খুযূর সাথে নামায আদায়ের বিষয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। এসময় থেকেই খুশু-খুযূকে অভ্যাসে পরিণত করা।

রমযান মাসে প্রতিটি আমলের আজর ও সওয়াব অন্য সকল সময়ের চেয়ে বেশি। সেজন্য অধিক পরিমাণে নফল ইবাদতের চেষ্টা করা।

বিশেষ করে সুন্নত ইতিকাফ যেহেতু রমযান মাসে হয়ে থাকে, সেজন্য রমযান ও রোযার যাবতীয় হক আদায়ের ব্যাপারে সচেষ্ট হওয়া।

পুরো সময় কোনো না কোনো ইবাদতে মগ্ন থাকা। তবে অন্যের ইবাদত বা ঘুম-বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটে, এমন উদ্যোগ পরিহার করা।

যেমন কেউ নামায পড়ছে কিংবা পাশেই বিশ্রাম করছে, সেসময়  উচ্চৈঃস্বরে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করা।

বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কারো সাথে কোনো কথা না বলা।

একান্ত প্রয়োজনে কথাবার্তা হলে নম্রতা, কোমলতা ও সম্মান বজায় রেখে কথা বলা।

কারো সাথে কোনো কটু কথা না বলা। ঝগড়া-তর্ক তো সব সময়ই মন্দ কাজ। মসজিদে, রমযান মাসে এবং ইতিকাফরত অবস্থায় সেটা আরো মন্দ কাজ। অতএব সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখা।

অধিক পরিমাণে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করা। সালাফে সালিহীনের রমযান-কেন্দ্রিক কুরআন তিলাওয়াতের ঘটনাগুলো স্মরণ করা।  সে অনুযায়ী বেশি থেকে বেশি কুরআন খতমের চেষ্টা করা। (যাদের পক্ষে সম্ভব) অর্থ মর্ম খেয়াল করে করেই তিলাওয়াত করা। অন্তত কিছু সময় তিলাওয়াতকৃত আয়াতের তরজমা, তাফসীর খেয়াল করে করে পড়া।

নফল নামাযের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া। কিছু নফল নামায তো বিভিন্ন সময়ের সাথে নির্দিষ্ট। যেমন তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত, যাওয়াল, আওয়াবীন ইত্যাদি। সাধারণ সময়ে নানা কর্মব্যস্ততার দরুন নিয়মিত এ নামাযগুলো আদায় করা হয় না। ইতিকাফের দিনগুলোতে যেন এর কোনোটি না ছোটে সে ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া।

এছাড়াও সালাতুল হাজত, সালাতুশ শোকর, সালাতুত তওবা এবং অন্যান্য নফল নামায আদায়ের চেষ্টা করা।

দীর্ঘ কিয়াম, দীর্ঘ রুকু ও দীর্ঘ সিজদাবিশিষ্ট নামাযেরও বিভিন্ন ফযীলত রয়েছে। সেজন্য ইতিকাফের সময় এভাবে দীর্ঘ নামাযের প্রতিও মনোযোগী হওয়া।

জাগতিক ব্যতিব্যস্ততার কারণে হাদীসে বর্ণিত অনেক যিকির ও তাসবীহ নিয়মিত আদায় করার সুযোগ হয় না। এছাড়াও বুযুর্গদের আমলে যিকিরের যেসব কালিমা ও পরিমাণের কথা পাওয়া যায়, সেগুলোও সুযোগমতো আদায় করার চেষ্টা করা। যেমন, ছয় তাসবীহ, বারো তাসবীহ ইত্যাদি আদায়ের ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া।

ইতিকাফকারীর জন্য মসজিদে অবস্থানই একটি স্বতন্ত্র নেক আমল। অতএব তিলাওয়াত, যিকির ও অন্যান্য আমলে ক্লান্ত হয়ে পড়লে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করা কিংবা কিছুক্ষণ শুধু নীরবতাও অবলম্বন করা যায়। অনর্থক গল্প-কথাবার্তার চেয়ে সেটিই বেশি উত্তম।

এ সময় নির্বাচিত কিছু দ্বীনী কিতাবও অধ্যয়ন করা যায়। ইতিকাফের ফাযায়েল ও মাসায়েল এবং বুযুর্গদের ইতিকাফ ও রমযানের আমল বিষয়ক কিতাবও মুতালাআ করা যায়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই মহিমান্বিত আমলে শরীক হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমাদের ইতিকাফকে কবুল করুন এবং তাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের ওসীলা করুন। ইতিকাফের মাধ্যমে আমাদের ঈমান, আমল ও ইবাদতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ উপকৃত হওয়ার তাওফীক দান করুন আমীন।